পুঁইশাক চাষের উপযুক্ত সময় কখন জেনে নিন
পুইঁশাক গ্রীষ্মকালীন জনপ্রিয় একটি লতানো সবজি। গ্রাম অঞ্চলে আনাচে-কানাচে এর
দেখতে পাওয়া যায়। এই পুইঁশাক সাধারণত দুই ধরনের হয় সবুুজ ও লালচে রঙের পাতা ও
নরম ডাঁটাযুক্ত। ভিটামিন এ,সি,ক্যালসিয়াম এবং আয়রনের মতো প্রয়োজনীয় পুষ্টিগুনে
ভরপুর।
পুইঁশাক খুব সহজেই বাড়ির আঙিনায়,টবে এবং জমিতে চাষ করা যায়। অল্প সময়ের মধ্যেই
এটি খাবার উপযোগী হয়ে ওঠে। পুইঁশাকে রয়েছে ভিটামিন এ,সি,আয়রন ক্যালসিয়াম
যা দেহের হাড় শক্ত করে। পুইঁশাক গাছ কিভাবে চাষ করতে হয় ও এটি চাষ করে লাভবান
হওয়া যায় কি না বিস্তারিত থাকছে এই পোস্টটিতে।
সূচিপত্রঃ পুইঁশাক চাষের উপযুক্ত সময়, পদ্ধতি ও পরিচর্যা
- পুঁইশাক চাষের উপযুক্ত সময়
- টবে পুইশাক চাষ পদ্ধতি
- পুইশাক গাছের পরিচর্যা
- পুঁইশাকের পাতার দাগ রোগ
- হাইব্রিড পুঁইশাক
- পুঁইশাক চাষে লাভ
- লাউ চাষ পদ্ধতি
- হাইব্রিড লাউ চাষ পদ্ধতি
- লাউ গাছের রোগ ও প্রতিকার
- লেখকের শেষ কথা
পুঁইশাক চাষের উপযুক্ত সময়
মাঝারি দোআঁশ মাটি পুইঁশাক চাষ কারর জন্য সবচেয়ে ভালো। বীজ বপনের আগে বীজ
ভিজিয়ে রাখলে দ্রুত চারা গজাই। পুইঁশাক চাষের জন্য উপযুক্ত সময় দুটি নিম্নে
দেখানো হলো।
- গ্রীষ্মকালীন চাষ:ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল এসময়টাতে মাটি উষ্ণ ও আর্দ্র থাকে, যা বীজ অঙ্কুরোদগমের জন্য ভালো। আর ফলাফল পাওয়া যায় এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত।
- বর্ষাকালীন চাষ:জুন থেকে আগস্ট বর্ষার পানিতে গাছ ভালোভাবে বেড়ে ওঠে। আর ফল পাওয়া যায় আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত।
টবে পুইশাক চাষ পদ্ধতি
একটা পুঁইশাক গাছ লাগিয়ে সারা বছর কচি ডাটা পাবেন কিভাবে জানতে হলে সাথেই
থাকুন। একটি প্লাস্টিকের বালটি নিতে হবে ৯ ইঞ্চি চওড়া ও ১০ ইঞ্চি
গভীরতা। জৈব সার মিশ্রিত মাটি নিতে হবে ৫০% সাধারণ বালি মাটি, ২০% গোবর
সার, ২০% পাতা পচা ও পাতা পোড়া , ৫% কোকোপিট ,৩% খোল গুড়াও ২% সুধা
কম্পোস্ট। পুইশাকের চারাটি মাটি সরিয়ে বসাতে হবে টপে।
আরো পড়ুনঃ
পুঁইশাক খেলে কি হয়
সবজির চারা বসানোর পর অল্প পানি দিতে হয়, বেশি পানি দিলে চারার গোড়া
শক্ত হয়ে যায়। চারাটি বসানোর ১৫ দিন পর দেখতে পাবেন গাছটি অনেক বড় হয়ে
উঠেছে নতুন মাটি পেয়ে। আরও ৭ দিন পর এবার এই গাছটিকে সাপোর্ট সিস্টেম
দিতে হবে বা রাখতে হবে। কিভাবে সাপোর্ট সিস্টেম করতে হয় জেনে নিন, বাশের চটা
বালতির মধ্যে দুই দিকে দুটো বসিয়ে নিন, চটার গোয়াটা মাটি দিয়ে শক্ত করে
বসাতে হবে। এবার আড়াড়ি ভাবে কয়েকটি চটা বেঁধে মৌই এর মত করে ধাপ তৈরি করতে
হবে। এইটুকুই যথেষ্ট আর এইভাবেই হয়ে গেল একটা পুইশাকের মাচা।
পুইশাক গাছের পরিচর্যা
পুইশাক গাছের জন্য উপযুক্ত মাটি তৈরি করতে হবে এবং আগাছা পরিষ্কার রাখতে হবে।
সার প্রয়োগের ক্ষেত্রে গোবর সার, ইউরিয়া সার এবং টিএসপি সার ব্যবহার
করা যেতে পারে। বর্ষাকালে যেহেতু পানি হয় তার জন্য সেচ দিতে হয় না,
মাটিতে রস না থাকলে শেষ দিতে হবে। মাটি আগলা করতে হবে নিয়মিত এবং গাছের
গোড়ায় যেন পানি না জমে সে দেখেও খেয়াল রাখতে হবে।
পুঁইশাকের পাতার দাগ রোগ
পুইশাক গাছের একটি সাধারন রোগ হলো পাতায় লাল পোড়া দাগ ,যা বাজারমূল্য হ্রাস
করে কৃষকের ক্ষতি করে ছত্রাক এর আক্রান্ত হয়। রোগটি মূলত বীজ বাহিত বাতাস
বৃষ্টি ও সেজের পানি দ্বারা রোগটির জীবাণু বিস্তার ঘটে থাকে।
পুইশাক পাতার দাগ রোগের লক্ষণঃ
- পাতার ছোট ছোট বাদামী বা লালচে বাদামী রঙের দাগ দেখা যায়।
- দাগ গুলো ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে।
- অনেক সময় দাগগুলো একত্রিত হয়ে পুরো পাতা ছড়িয়ে পড়ে।
- আক্রান্ত পাতার বিবর্ণ ও দুর্বল হয়ে যায় এবং একসময় ঝড়ে পড়ে।
ব্যবস্থাপনা ও প্রতিকারঃ
- রোগমুক্ত বীজ ব্যবহার করুন।
- আক্রান্ত পাতা ও ডালপালা অপসারণ করুন।
- বীজ লাগানোর আগে বীজ শোধন করুন।
- জমিতে রসের অভাব পুষ্টির অভাব হলে এই রোগ গুলো দেখা যায়।
হাইব্রিড পুঁইশাক
হাইব্রিড পুঁইশাক বলতে আমরা বুঝি সতেজ তাজা মোটা এবং উন্নত
জাতের শাক। হাইব্রিড পুঁইশাক সাধারণত উচ্চ ফলনশীল এবং
রোধ প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন হয়ে থাকে। হাইব্রিড পুইশাকে মোটা ডগা এবং
বেশি পাতা থাকে যা একে বাজারে জনপ্রিয় করে তোলে এবং কৃষককে লাভবান করে
তোলে।সাধারণ পুইশাকের চেয়ে বেশি ফলন দেয় হাইব্রিড পুইশাপ। এই
জাতের পুইশাকের ডাটা বেশ মোটা হয় যা বাজারে আকর্ষণীয় করে তোলে
সবাইকে।
আরো পড়ুনঃ পুঁইশাক খেলে কি গ্যাস হয়
দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং অল্প সময়ের সময়ের মধ্যে ফসল সংগ্রহ করা
যায়। কিছু কিছু হাইব্রিড পুঁইশাক রোগ প্রতিরোধের সক্ষম। প্রায় সব ধরনের এই
পুঁইশাক চাষ করা যায়। হাইব্রিড পুঁইশাক চাষের জন্য প্রথমে একটি মাটি বা
জায়গা প্রস্তুত করে নিতে হবে। এরপর বীজ বর্পণ করে চারা তৈরি করতে হবে,
এছাড়া প্রয়োজন অনুযায়ী আগাছা পরিষ্কার করতে হব্ বাজারে বিভিন্ন কোম্পানির
হাইব্রিড পুঁইশাক বীজ পাওয়া যায় যেমনঃ এ আর মালিক, লাল তীর, ইউনাইটেড,
সুপ্রিম সীড কোম্পানি ইত্যাদি। হাইব্রিড পুঁইশাক চাষ করে কৃষক অধিক
লাভবান হতে পারে।
পুঁইশাক চাষে লাভ
অল্প খরচে যদি লাভবান হতে চান তাহলে এই পোস্টটি আপনার জন্য। পুঁইশাক
চাষের তুলনামূলকভাবে খরচ কম এবং অল্প সময়ের মধ্যে ভালো ফল পাওয়া যায়।
বাজারে পুঁইশাকের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে বিশেষ করে শহরাঞ্চলের চাহিদা আরও
বেশি। পুঁইশাক চাষে খুব বেশি জায়গার প্রয়োজন হয় না তাই বাড়ির
আশেপাশে বা অল্প জমিতে এর চাষ করা যেতে পারে। জৈব সার ব্যবহার করে পুঁইশাক
চাষ করলে ভালো ফলন পাওয়া যায়। পুঁইশাকের সাধারণত রোগ ও পোকামাকড়ের
আক্রমণ কম হয়, তবে কিছু ক্ষেত্রে রোগবালাই দেখা যেতে পারে।
পুইশাকের চারা রোপনের জন্য উপযুক্ত সময় হলো এপ্রিল- মে মাস তবে সারা
বছরে এর চাষ করা যায়। চারা রোপনের জন্য দূরত্ব ১ মিটার এবং প্রতি সারিতে ৫০
সেন্টিমিটার দূরে যারা রোপন করতে হয়। পুইশাক বাজারজাত করার জন্য একটি ভালো
পরিকল্পনা থাকা দরকার, স্থানীয় বাজার বা পাইকারি বাজারে বিক্রয় করে ভালো
লাভ করা যেতে পারে।
লাউ চাষ পদ্ধতি
লাউ চাষের জন্য দোআঁশ বা বেলে দোআঁশ মাটি নির্বাচন করতে হবে। বীজ বপনের
আগে ১২ ঘন্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে। চারা তৈরি করার জন্য পলিথিন ব্যাগ
ব্যবহার করা ভালো, বালি,মাটি এবং পচা গোবরের মিশ্রণ ব্যবহার করতে হরে।চারা
১৫-১৭ দিন হলে জমিতে রোপণ করতে হবে। লাউয়ের বীজ সাধারণত ভাদ্র-কার্তিক এবং
ফাল্গুন-জ্যৈষ্ঠ মাসে বপন করা হয়। চারা রোপণের ১৫,৩৫,৫৫ ও ৭৫ দিন পর ইউরিয়া ও
এমওপি সার প্রয়োগ করতে হবে। লাউ সাধারণত মাচায় চাষ করা হয়, মাচা তৈরির জন্য
বাঁশ বা অন্য কোন উপযুক্ত উপকরণ ব্যবহার করা পারেন।এতে করে লাউ গাছ ঠিকভাবে
বেড়ে উঠতে পারে এবং ফল ভালো দিতে পারে।
হাইব্রিড লাউ চাষ পদ্ধতি
লাউ একটি শীতকালীন সবজি। লাউ চাষ করার জন্য মাটির মান ভালো হতে হয়। সার
প্রয়াগ এবং পোকামাকড় ও রোগবালই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে গাছের সঠিক পরিচর্যা
করতে হবে।
হাইব্রিড লাউ চাষের পদ্ধতিঃ
- হাইব্রিড লাউ চাষের জন্য বেশি শীত বা বেশি গরম নয়,এমন আবহাওয়া লাউ চাষের জন্য উপযুক্ত সময়।
- দোআঁশ থেকে এটেল দোআঁশ মাটি লাউ চাষের জন্য ভালো।
- জমিতে পর্যাপ্ত পরিমানে সূর্যালোক থাকতে হবে।
- জমিতে পর্যাপ্ত জৈব সার প্রয়োগ করতে হবে।
- ৪-৫ টি চাষ ও মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করে নিতে হবে।
- লাউ গাছ বীজ থেকে চারা তৈরি করতে হয়।
- বীজ বপনের পর হালকা সেচ দিতে হয়।
- বীজ বপনের দূরত্ব ১-২ মিটার রাখতে হবে।
আরো পড়ুনঃ গর্ভাবস্থায় পুঁইশাক খাওয়ার উপকারিতা
- রোপণের পূর্বে জমিতে প্রয়োজনীয় জৈব সার প্রয়োগ করতে হবে।
- জমিতে রসের অভাব দেখা দিলে সেচ দেওয়া প্রয়োজন।
- বিশেষ করে ফুল ও ফল আসার সময় সেচ দেওয়া জরুরী।
- জমিতে নিয়মিত আগাছা পরিষ্কার করতে হবে।
- পোকামাকড় ও রোগবালাই থেকে ফসল রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে ।
লাউ গাছের রোগ ও প্রতিকার
লাউ গাছে বিভিন্ন ধরনের রোগ দেখা যায়। যেমনঃ ফলের গায়ে বাদামী দাগ দেখা যায়
এবং পচন ধরে। পাতার গায়ে হলুদ থেকে বাদামী দাগ দেখা যায় পরে ওই পাতা নষ্ট
হয়ে যায়। ফল পচে যাওয়ার কারণ হতে পারে ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম ও বোরনের
অভাবে এমনটি হতে পারে।
প্রতিকারঃ
- বীজ সংরক্ষণে সতর্ক থাকতে হবে।
- জমিতে পর্যাপ্ত আলো বাতাসের চলাচল ব্যবস্থা করতে হবে।
- রোগাক্রান্ত গাছের সংখ্যা সরিয়ে ফেলতে হবে।
লেখকের শেষ কথা
আশা করি, উপরের আলোচনা থেকে পুইঁশাকের উপযুক্ত সময়, গাছের পরিচর্যা ও রোগ
সম্পকে জানতে পেরেছেন। আপনি আপনা বাড়ির ছাদে চাষ করতে পারেন। যার ফলে সারা
বছর নিজ চাষ করা ও কীটনাশক মুক্ত শাক-সবজি খেতে পারেন। আবার বাড়ির আশেপাশে
রোদযুক্ত জায়গা থাকে লাউ চাষ করতে পরেন বিক্রি করতে পারবে। সারাবছর
কীটনাশকমুক্ত সজবি খেতে চাষ করুন।
নাইস-সল্ভ; আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url